২০২৬ সালের রমজানের সময়সূচি, ফজিলত, নিয়ত ও পূর্ণাঙ্গ গাইড
রহমত ও ক্ষমার বার্তা নিয়ে আসে পবিত্র মাহে রমজান। এ মাসে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গোনাহ মাফ করেন, জান্নাতের দরজা খুলে দেন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। মুসলিম জীবনে এই মাসের গুরুত্ব অনন্য। তাই ২০২৬ সালের রমজানকে সামনে রেখে এখানে দেওয়া হলো - রোজার সঠিক নিয়ত, সাহরী ও ইফতারের দোয়া, ৩০ রোজার পূর্ণ সময়সূচি (ঢাকা ভিত্তিক সম্ভাব্য সময়), করণীয়-বর্জনীয়, ফজিলতসহ একটি পূর্ণাঙ্গ আর্টিকেল।
📌 ২০২৬ সালের রমজানের তারিখসমূহ ঃ
- রমজান শুরু (সম্ভাব্য প্রথম রোজা) : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (বুধবার) - চাঁদ দেখা সাপেক্ষে
- রমজানের সম্ভাব্য শেষ দিন : ২০ মার্চ ২০২৬
- ঈদুল ফিতর (সম্ভাব্য) : ২১ মার্চ ২০২৬, চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল
ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত তারিখ।
রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব ঃ
রমজান মাসকে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে “হুদা লিন্নাস” বা মানুষের জন্য হিদায়তের মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ মাসে নেকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং গোনাহ ক্ষমা লাভের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।
রমজানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত ঃ
- এ মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে - যা মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান।
- এ মাসে লাইলাতুল কদর আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
- যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয় (সহিহ হাদীস)।
- রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়েও প্রিয়।
- রমজান তাকওয়া অর্জনের উত্তম প্রশিক্ষণ - যার মাধ্যমে মানুষ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে শেখে।
২০২৬ সালের রমজান মাসের পূর্ণ ৩০ দিনের সাহরী ও ইফতার সময়সূচি (ঢাকা)
নিচের সময়সূচি ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য একটি সম্ভাব্য ক্যালেন্ডার হিসেবে দেওয়া হলো। সেহরির শেষ সময় হিসেবে এখানে মূলত ফজরের সময় ধরা হয়েছে। নিরাপদ হওয়ার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সাধারণত ফজরের সময়ের অন্তত ৩–৫ মিনিট আগে সেহরি শেষ করা উত্তম।
| রমজান | তারিখ ও বার | সাহরীর শেষ সময়* | ইফতারের সময় |
|---|---|---|---|
| ১ | ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহঃ) | ৫:১২ AM | ৫:৫৮ PM |
| ২ | ২০ ফেব্রুয়ারি (শুক্র) | ৫:১১ AM | ৫:৫৮ PM |
| ৩ | ২১ ফেব্রুয়ারি (শনি) | ৫:১১ AM | ৫:৫৯ PM |
| ৪ | ২২ ফেব্রুয়ারি (রবি) | ৫:১০ AM | ৫:৫৯ PM |
| ৫ | ২৩ ফেব্রুয়ারি (সোম) | ৫:০৯ AM | ৬:০০ PM |
| ৬ | ২৪ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গল) | ৫:০৮ AM | ৬:০০ PM |
| ৭ | ২৫ ফেব্রুয়ারি (বুধ) | ৫:০৮ AM | ৬:০১ PM |
| ৮ | ২৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহঃ) | ৫:০৭ AM | ৬:০১ PM |
| ৯ | ২৭ ফেব্রুয়ারি (শুক্র) | ৫:০৬ AM | ৬:০২ PM |
| ১০ | ২৮ ফেব্রুয়ারি (শনি) | ৫:০৫ AM | ৬:০২ PM |
| ১১ | ১ মার্চ (রবি) | ৫:০৫ AM | ৬:০৩ PM |
| ১২ | ২ মার্চ (সোম) | ৫:০৪ AM | ৬:০৩ PM |
| ১৩ | ৩ মার্চ (মঙ্গল) | ৫:০৩ AM | ৬:০৪ PM |
| ১৪ | ৪ মার্চ (বুধ) | ৫:০২ AM | ৬:০৪ PM |
| ১৫ | ৫ মার্চ (বৃহঃ) | ৫:০১ AM | ৬:০৫ PM |
| ১৬ | ৬ মার্চ (শুক্র) | ৫:০০ AM | ৬:০৫ PM |
| ১৭ | ৭ মার্চ (শনি) | ৪:৫৯ AM | ৬:০৬ PM |
| ১৮ | ৮ মার্চ (রবি) | ৪:৫৮ AM | ৬:০৬ PM |
| ১৯ | ৯ মার্চ (সোম) | ৪:৫৭ AM | ৬:০৭ PM |
| ২০ | ১০ মার্চ (মঙ্গল) | ৪:৫৭ AM | ৬:০৭ PM |
| ২১ | ১১ মার্চ (বুধ) | ৪:৫৬ AM | ৬:০৭ PM |
| ২২ | ১২ মার্চ (বৃহঃ) | ৪:৫৫ AM | ৬:০৮ PM |
| ২৩ | ১৩ মার্চ (শুক্র) | ৪:৫৪ AM | ৬:০৮ PM |
| ২৪ | ১৪ মার্চ (শনি) | ৪:৫৩ AM | ৬:০৯ PM |
| ২৫ | ১৫ মার্চ (রবি) | ৪:৫২ AM | ৬:০৯ PM |
| ২৬ | ১৬ মার্চ (সোম) | ৪:৫১ AM | ৬:১০ PM |
| ২৭ | ১৭ মার্চ (মঙ্গল) | ৪:৫০ AM | ৬:১০ PM |
| ২৮ | ১৮ মার্চ (বুধ) | ৪:৪৯ AM | ৬:১০ PM |
| ২৯ | ১৯ মার্চ (বৃহঃ) | ৪:৪৮ AM | ৬:১১ PM |
| ৩০ | ২০ মার্চ (শুক্র) | ৪:৪৭ AM | ৬:১১ PM |
সাহরী ও ইফতারের পূর্ণাঙ্গ ক্যালেন্ডার
নিচে ২০২৬ সালের রমজান মাসের একটি সুন্দর ও সহজবোধ্য ক্যালেন্ডার প্রিভিউ দেওয়া হলো। এখানে সাহরীর শেষ সময় ও ইফতারের সময় এক নজরে দেখা যাবে। এটি মোবাইল ও প্রিন্ট-উভয়ের জন্য উপযোগী।
রোজার নিয়ত ও ইফতারের দোয়া ঃ
📌 রোজার নিয়ত :
উচ্চারণ : নাওয়াইতু আন আছূমা গাদাম, মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসের ফরজ রোজা আপনার সন্তুষ্টির জন্য রাখার নিয়ত করলাম। অতএব, আপনি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।
📌 ইফতারের দোয়া :
ইফতারের সময় নিচের দোয়া ১ অথবা ২ - যেকোনো একটি পড়া যায়
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ওয়া ‘আলা রিযক্বিকা আফতারতু।
অর্থ : হে আল্লাহ! তোমারই সন্তুষ্টির জন্য আমি রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিযিক দিয়ে আমি ইফতার করছি।
উচ্চারণ : যাহাবাজ্-যমাউ, ওয়াবতাল্লাতিল ‘উরূক, ওয়া সাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ।
অর্থ : পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহ চাইলে সাওয়াব স্থির হয়ে গেল।
📌 রমজানের চাঁদ দেখার দোয়া ঃ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-য়ুমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ।
অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে সৌভাগ্য ও ইমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন।আল্লাহই আমার ও তোমার রব। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫১)
রমজানে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল ঃ
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতসহ আদায় করার চেষ্টা করা।
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা (যেমন - দিনে অন্তত ১ পারা বা কয়েক পৃষ্ঠা)।
- জিকির, তাসবিহ, দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়া।
- অন্যকে ইফতারে দাওয়াত দেওয়া বা গরিব-দুঃখীদের ইফতারের ব্যবস্থা করা।
- চোখ, কান ও জিহ্বাকে গুনাহ থেকে হেফাজত করা - গীবত, গালি, অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা।
- রমজানে নিজের চরিত্র ও অভ্যাস সংশোধনের জন্য লিখিত লক্ষ্য বানানো (যেমন - মিথ্যা ছাড়ব, গীবত ছাড়ব ইত্যাদি)।
রমজানে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও পরামর্শ ঃ
- ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান।
- অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও মিষ্টি খাবার কমিয়ে দিলে শরীর হালকা থাকে, তারাবিহ ও ইবাদতে কষ্ট কম হয়।
- ডায়াবেটিস বা অন্য রোগ থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা রাখা উচিত।
শেষ দশ রাত্রি, লাইলাতুল কদর ও ইতিকাফ ঃ
রমজানের শেষ দশ রাত্রি হলো রহমত ও মাগফিরাতের সেরা সময়। এ দশকে থাকা লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাই এ সময় ইবাদত ও দোয়ার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।
- বিজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) বেশি ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
- নফল নামাজ, কিয়ামুল লাইল, কুরআন তিলাওয়াত ও বেশি বেশি দোয়া করা।
- নিজের, পরিবারের, উম্মাহর জন্য ক্ষমা ও হিদায়াত কামনা করা।
ইতিকাফের গুরুত্ব ঃ
রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল-কিফায়া। কেউ করলে বাকিদের থেকে দায় সরে যায়। ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়াবি কাজ থেকে অনেকটা আলাদা হয়ে পুরো সময়টুকু ইবাদতে কাটানোর সুযোগ পায়।
রমজানে করণীয় ও বর্জনীয় ঃ
- রোজা, নামাজ, কুরআন, দোয়া, জিকির - সব আমলে নিজেকে অভ্যস্ত করার চেষ্টা করা।
- মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের সাথে উত্তম আচরণ করা।
- দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা।
- গীবত, পরনিন্দা, মিথ্যা কথা, গালি–গালাজ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
- টাইমপাসের নামে সারাদিন সিরিজ/ফিল্ম/সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকা।
- ইফতারের টেবিলে অপচয়, দেখনদারি ও অহংকার প্রকাশ না করা।
শেষ কথা ঃ
রমজান আমাদের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ দান। এ মাসের প্রতিটি দিন ও রাতকে গুনাহ থেকে মুক্তি, নেকি অর্জন ও দোয়া কবুলের সোনালী সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত। ২০২৬ সালের রমজান আমাদের জন্য হোক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি বরকতময় অধ্যায় (আমিন)।


0 Comments
post a comment